আত্মসংযমের শিক্ষা দেয় রমজান

আত্মসংযমের শিক্ষা দেয় রমজান

ভালো ও মন্দ উভয় গুণের সমন্বয়ে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বানিয়েছেন। মানুষের মন সব সময় মন্দের দিকে সব সময় ধাবিত থাকে। তার এই দেহ-মনকে সংযমের অনুশাসনে রাখতে দিয়েছেন বিভিন্ন নিয়ম ও অনুশাসন। দিয়েছেন রমজান মাস। ইসলামি শরিয়ত বা জীবনবিধানের পরিপন্থী যাবতীয় অসামাজিক ও অমানবিক কার্যাবলি পরিহার করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও তাকওয়া অর্জনের কঠোর সিয়াম সাধনাই হলো মাহে রমজানের মূলকথা। রোজা পালনের মধ্য দিয়ে মানুষের ইচ্ছাশক্তির বিকাশ, সংযম ও আত্ম-উন্নয়ন ঘটে। সিয়াম অর্থ আত্মসংযম। মিথ্যাচারিতা, আজেবাজে, অহেতুক কথা বলা, চোখের গিবত ও কটু বাক্য থেকে জিবকে সংযত রাখা, প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের হেফাজত করা এবং হারাম মাল না খাওয়া সর্বক্ষেত্রেই সংযত হওয়া বাঞ্ছনীয়। রমজান মাসে সিয়াম প্রকৃতই রোজাদারদের হাত, পা, মুখ ও অন্তঃকরণকে সংযত করে। সৎ কর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের রোজা চোখ, কান, জিব, হাত, পা ও দৈহিক সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে যাবতীয় গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে অর্জিত হয়। যেমন চোখকে অবৈধ দৃষ্টিপাত থেকে ফিরিয়ে রাখা। এ সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘মন্দ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করা শয়তানের একটি বিষমিশ্রিত তির।’ যে আল্লাহর ভয়ে এটা বর্জন করে, আল্লাহ তাআলা তাকে ইমানের এমন নূর প্রদান করেন, যার আস্বাদন সে অন্তরে অনুভব করে। দেহকে আত্মনিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দৈহিক প্রেরণাকে সংযত করতে হয়। আত্মিক শক্তিকে সমৃদ্ধ করতে হয়। দৈহিক কামনা-বাসনাকে সংযত করার জন্য একদিকে ক্ষুধা, তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য ও রিপুর তাড়নাকে পরিত্যাগ করতে হয়, অপরদিকে জিব ও মনের চাহিদা এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এভাবে দৈহিক আকাঙ্ক্ষা ও প্রেরণাকে যত সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, অন্য কোনোভাবে তা সম্ভব নয়। তাই হারাম জিনিস দেখা, নিষিদ্ধ কথা শ্রবণ করা ও হারাম কাজ সম্পাদন করা প্রভৃতি থেকে নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে অবশ্যই বিরত রাখা উচিত। তবেই রোজার স্বাদ অনুভূত হবে এবং রোজাও প্রাণববন্ত হবে। মাহে রমজানে ত্যাগ ও সংযম সাধনার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘পাঁচটি বিষয় রোজাদারের রোজা বিনষ্ট করে দেয়—মিথ্যা বলা, কূটনামি করা, পশ্চাতে পরনিন্দা করা, মিথ্যা শপথ করা ও খারাপ দৃষ্টিতে তাকানো।’ মাহে রমজানে সংযম আর নিরলস সাধনা হলো নিজের বিরুদ্ধে, নফস, রিপু ও লালিত কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘প্রকৃত মুজাহিদ তো সে-ই যে তার নিজের নফস ও রিপুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।’ (মুসনাদে আহমাদ) সিয়াম সাধনার বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অনর্থক কথাবার্তা, মিথ্যাচার, পরনিন্দা, গিবত, কটুবাক্য ব্যবহার প্রভৃতি গর্হিত কাজ থেকে জিবকে সংযম অবস্থায় রাখতে হবে। তাই নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘রোজা ঢালস্বরূপ! তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখে, তখন যেন মুখ দিয়ে অশ্লীল ও খারাপ কথা না বলে, কেউ তার সঙ্গে ঝগড়া করলে অথবা গালি দিলে সে যেন বলে, আমি রোজাদার।’ (বুখারি) রোজাদারকে খারাপ কথা শ্রবণ করা থেকে নিজের কানকে বিরত রেখে সাধনা করতে হবে। কেননা যেসব কথা বলা হারাম, সেগুলো শ্রবণ করাও হারাম। এ কারণেই মিথ্যা শ্রবণকারী ও হারাম ভক্ষণকারীদের পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘গিবতকারী ও শ্রবণকারী উভয়েই গুনাহের অংশীদার।’ সুতরাং রমজান মাসে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকা, রুটিন মোতাবেক উপবাস করা, মসজিদে যাওয়া, তারাবি নামাজ পড়া, ইফতার আর সেহ্রি খাওয়াতেই রোজাব্রত পালন সম্পন্ন হয় না, এর সঙ্গে রোজাদার ব্যক্তির দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সংযম সাধনা করা বাঞ্ছনীয়। রোজাদারদের চোখকে খারাপ জিনিস দেখা থেকে বিরত রাখতে হবে। পা-কে অসৎ কাজে অগ্রসর হতে বাধা দিতে হবে। হাতকে চুরি, ডাকাতি, ঘুষ-দুর্নীতি, ছিনতাই, রাহাজানি, খুন-খারাবি, ধর্ষণ, অপহরণ, মজুতদারি, চোরাকারবারিসহ সব ধরনের অবৈধ কাজকর্ম থেকে বা হারাম খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখতে হবে। কানকে নিষিদ্ধ কোনো কিছু শোনা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। মনকে কামনা-বাসনা, হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসামুক্ত রেখে মৃত্যু ও পরকালীন হিসাব-নিকাশের কথা সর্বদা স্মরণে রেখে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জনে উন্মুখ হতে হবে। এভাবে মাহে রমজানের কঠোর সংযম সাধনা ও নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করতে হবে আগামী ১১টি মাস। তাহলেই সিয়াম পালন ও সংযম সাধনা পূর্ণাঙ্গ হবে। রোজা মানুষকে সংযমী মনোভাব গড়ে তোলার অতুলনীয় শিক্ষা দেয়। সংযত ও নিষ্ঠাবান হওয়ার যে শিক্ষা সিয়ামে রয়েছে, আমরা যেন ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি, যার ওপর নির্ভর করবে প্রকৃত রোজাদারদের সংযম সাধনা প্রকৃতপক্ষে ত্যাগ ও সংযম সাধনার মাসে লাগামহীনভাবে জীবন যাপন করা যায় না। ইচ্ছা ও আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও হালাল খাদ্য গ্রহণ এবং বৈধ ভোগ্যসামগ্রী দিনের বেলা উপভোগ করা যায় না। তাই মাহে রমজান রোজাদারদের অত্যন্ত সংযত ও মার্জিত হতে শিক্ষা দেয়। পৃথিবীতে যারা সফলকাম হয়েছেন, তারা সবাই পানাহারে ও রিপুর চাহিদা মেটাতে সংযমী ছিলেন। মানুষের মধ্যে যেসব কুপ্রবৃত্তি রয়েছে, তা মানুষকে অন্যায়-অত্যাচার ও পাপাচারে লিপ্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। মাহে রমজানের রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে পশুপ্রবৃত্তিকে দমন করা এবং ইমানি শক্তিতে বলীয়ান হওয়া। বছরের ১১ মাস প্রচুর খাওয়ার পর রমজানের এক মাস কিছুটা কম খেয়ে সংযম সাধনা করলে তেমন অসুবিধা হয় না। যার ইন্দ্রিয় তৃষ্ণা প্রবল তাকে রোজা রাখার জন্য উপদেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ১২ মাসের মধ্যে একটি মাস ইন্দ্রিয় সংযমের জন্য রোজা পালনের ব্যবস্থা করেছেন। মনে রাখতে হবে, রমজান মাস ত্যাগের মাস, ভোগের নয়। রমজান মাস দান-খয়রাতের মাধ্যমে আখিরাত অর্জনের মাস, অধিক মুনাফার মাধ্যমে দুনিয়া অর্জনের মাস নয়। যদি কোনো ব্যক্তি বৈধ পন্থায় হালালভাবে ব্যবসা করেন, তবে আল্লাহ তাতেই বরকত দেবেন। অন্যায়ভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দ্বীনদার পরহেজগার রোজাদারদের কষ্ট দিলে, ওই অর্থ ও সম্পদ তার উপকারে না-ও আসতে পারে। মুনাফার প্রতি মানুষের আকর্ষণ সহজাত। তাই আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনে প্রকৃত লাভ কী, তা বলে দিয়েছেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! আমি কি তোমাদের এমন এক ব্যবসার প্রতি নির্দেশনা দেব, যা তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে রক্ষা করবে? তা হলো তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি ইমান আনবে এবং তোমাদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করবে। এটিই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা বুঝতে পারো।’ (সুরা-৬১ সফ, আয়াত: ১০)। এরপরও যারা দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন, তারা বিশ্বাসী দাবি করলেও আসলে তারা মুনাফিক। তাদের উদ্দেশে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা হেদায়েতের পরিবর্তে গোমরাহি ক্রয় করেছে। ব্যবসায় তারা লাভবান হতে পারেনি; আর তারা হেদায়েতপ্রাপ্তও নয়।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৬)। রোজা মানুষকে সংযমী মনোভাব গড়ে তোলার অতুলনীয় শিক্ষা দেয়। সংযত ও নিষ্ঠাবান হওয়ার যে শিক্ষা সিয়ামে রয়েছে, আমরা যেন ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি, যার ওপর নির্ভর করবে প্রকৃত রোজাদারদের সংযম সাধনা। সব ধরনের অন্যায়, অশোভন, অনাচার, দুরাচার, পাপাচার, অকল্যাণকর কাজকর্ম থেকে বিরত হয়ে সংযম সাধনার পথ ধরে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয় এ মাহে রমজান। কিন্তু আমরা যদি নিজেদের মধ্যে সংযম ও আত্মসংশোধন না আনতে পারি এবং আগের মতো অন্যায় কাজে লিপ্ত থেকে রোজা পালন করি, তাহলে এ ধরনের সিয়াম সাধনার কোনো মূল্যই আল্লাহর কাছে পাওয়া যাবে না। তাই সংযম সাধনার মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় একজন রোজা পালনকারী ইমানদার মুসলমানকে অবশ্যই হতে হবে বাক্সংযমী, লোভসংযমী, অপকর্মে সংযমী, নিদ্রায় সংযমী, নিষিদ্ধ কর্মে সংযমী, আচরণে সংযমী।