এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘর

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : প্রায় আড়াইশ’ বছরের পুরনো ঢাকার ঐতিহাসিক নিমতলী প্রাসাদ

এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘর
এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘর

প্রায় আড়াইশ’ বছরের পুরনো ঢাকার ঐতিহাসিক নিমতলী প্রাসাদ। এশিয়ার এক অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন এই প্রাসাদ ব্যাপক পরিচিত সবার কাছে। ২৫০ বছর আগের পুরনো এই প্রাসাদ এখন এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। ঐতিহ্য আর জ্ঞানের এক অপরূপ সমন্বয় করা হয়েছে এই জাদুঘরে। ঢাকার মোগল নায়েব-নাজিমদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল নিমতলী প্রাসাদ। তবে এর পুরোটাই এখন প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। কেবল ভবনের প্রধান প্রবেশদ্বারটিই টিকে আছে, যার নাম ‘নিমতলীর দেউড়ি’। আর এখানেই করা হয়েছে এশিয়াটিক সোসাইটির ঐতিহ্য জাদুঘর। জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিকট অতীত ঐতিহ্য তুলে ধরতেই এই জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়েছে। ঢাকার আদি নবাবদের স্মৃতিবিজড়িত নিমতলী প্রাসাদ বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। এতে ১৭০০ থেকে ১৯০০ শতাব্দীর সময়কালের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে এই জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। একে একটি শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এই জাদুঘর স্থাপনের উদ্দেশ্য। তিনতলা সমান উঁচু এই ভবনের প্রবেশপথটি ঠিক মাঝখানে। দেউড়ি ভবনের নিচতলায় ডান দিকে পাশাপাশি দু’টি ঘর। প্রতি ঘরের তিন দিকে দেয়ালে স্মারক রাখার জায়গা করা হয়েছে। আর বাঁয়ে আছে একটি ঘর। দেউড়ি ভবনটিতেই ছিল এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম অফিস। নিচতলায় তাই রাখা হচ্ছে এশিয়াটিক সোসাইটির নানা স্মারক।

কি কি দেখতে পাবেন প্রথম তলায় তিনটি ঘর দেখে সরু একটি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতেই দেখতে পাবেন একটি মাত্র ঘর। যেখানে শোভা পাচ্ছে আলোকচিত্র, তৈলচিত্রসহ বেশ কিছু। তৃতীয় তলায় বড় ঘরটি ৪৫ ফুট দীর্ঘ। দেয়ালে আলোকচিত্র আর তৈলচিত্রের পাশাপাশি সংরক্ষণ করা হয়েছে মসলিন, ধাতব মুদ্রা এবং তৈজসপত্র। ঘরের মাঝ বরাবর পশ্চিম পাশে সাজানো হয়েছে নায়েব নাজিমের দরবার। পেছনের এলইডি পর্দায় দরবারের ছবি দেখানোর ব্যবস্থা আছে। এই জাদুঘরটি সময়কাল ধরে সাজানো হয়েছে। পুরো ভবনটা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে আপনি নবাবি আমলে ফিরে যেতে পারেন। এখানে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় স্মারক সম্পর্কিত ইতিহাস শোনার সুযোগ পাবেন। তৎকালীন ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের ছোঁয়া পাবেন এখানে। আছে নবাবদের তালিকা। তাদের কাজকর্মের বর্ণনা আছে। নবাবদের আওতায় ত্রিপুরা আর চট্টগ্রামও ছিল। তার বর্ণনাও আছে। তখনকার দালানকোঠা, মসজিদ, ভবন সম্পর্কেও তথ্য আছে। ঢাকার গান-বাজনা, পোশাক, খাবার নিয়েও পাবেন অনেক তথ্য। এই জাদুঘরে দেখতে পাবেন মসলিন শাড়ি, ধাতব মুদ্রা, আসবাবপত্র, তৈজসপত্র, দরবারে ব্যবহার হতো এমন হুঁকা, কাঁটাচামচ, চাকু, রাইচ ডিশ, প্লেট, বাটি, স্যুপের পাত্র, শাড়ি, শাল, হরিণের শিং, ক্যাশবাক্স, বাতি, কলস, ঝাড়বাতি, পানদান, কুরআন শরীফ, গয়নার বাক্স, সাবানদানী, দোয়াত ইত্যাদি। তের জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে।

আরও আছে এখানে আরো দেখতে পাবেন নবাবী আমলের নিদর্শন যেমন -এখলাই, শা হুক্কার খোল, ঝাড়বাতি, প্রদীপ বা মোমদান, কাঠের বাতি, ঘণ্টা, টোকরা, কাচের কুপি, আতরদান, পানের কৌটা, অলঙ্কৃত গহনার বাক্স, খাসদান, গাড়ু, ফুলের সাজি, গ্লাস, হুক্কা, গোলাপ পাশ, পালকি, খড়ম, হাতপাখা, দলিল/দস্তাবেজ/দলিলের অধ্যায়/ফরমান, সিঁদুরের কৌটা, আফতাবা, চীনামাটির পাত্র (ডিশ, প্লেট, ফুলদানি, কারি ডিশ, টিফিন ক্যায়িরার বা বাক্স, বাসনকোসন, জার, ফানুস, চিমনি); বাদ্যযন্ত্র (বেহালা, ম্যানডোলিন, পিয়ানো, পাখোয়াজ ও গ্রামোফোন); পোশাক-পরিচ্ছদ (চোগা) মসলিন, চাপকান, কানপোস ও শতরঞ্জি); নকশিকাঁথা (দস্তরখান, মোটা কাঁথা); কাঠের শিল্পকর্ম (পালঙ্ক, বেড়া, সিন্দুক, ঢেঁকি ও ভাস্কর্য); মিনিয়েচার পেইন্টিং, চিত্রকলা, তলোয়ার, খেলাধুলা সরঞ্জাম, নির্দেশাবলী/আদেশ, নায়েব-নাজিমদের আলোকচিত্র/প্রতিকৃতি, মুদ্রা/নোট ইত্যাদি। খরচ জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য প্রবেশ মূল্য ২০/- টাকা এবং ছাত্র-ছাত্রীদের পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে ১০/- টাকা। এছাড়া বিদেশি দর্শকদের জন্য ২০০/- টাকা প্রবেশমূল্য।