মায়াজাল

মোঃ মোশফিকুর রহমান

মায়াজাল

আচ্ছা কাঁদলেই নাকি মনটা হালকা হয়! কিন্তু গত কয়েকটা বছর ধরেই শামীমা অনবরত কেঁদেই যাচ্ছে,তার তো কান্নাও থামেনা আর মনটাও হালকা হয়না। আজকালতো মনে হয় কোনো জোয়ারের রাতে তাজুলের ইঞ্জিনের নৌকার দড়িটা ছেড়ে দিয়ে ভাসতে ভাসতে পশুর নদীর মাঝখানে যেয়ে ঝাঁপিয়ে পরে! কখনো মনে হয়,কোন একদিন জয়মনি যেয়ে সুন্দরবনের গভীর অরন্যের মাঝে হারিয়ে যাবে! সেখানে নাকি এখনো মাঝেসাজে দু’একটা বাঘের দেখা মেলে! সেখানে হয়তো কোনো বাঘ হামলে পরবে তার শরীরের উপর,তার শরীরটা ছিন্নভিন্ন করে খেয়েদেয়ে জিহ্বা বাহির করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলবে! নয়তো মানুষ রূপি বন দস্যুরা তার শরীর নিয়ে খেলা করে টুকরো টুকরো করে উত্তাল সাগরবুকে ছুঁড়ে ফেলবে! কিন্তু বুকের বাচ্চাটার মায়ায় কিচ্ছু করতে পারেনা! রাত হলেই সিগন্যাল টাওয়ার এলাকার নিয়ন বাতির আলো যখন অন্ধকারের সাথে পাল্লা দিয়ে মাঝরাতে আবছা আলোকিত হয়,তখনই তার ঝুপরি ঘরের চারপাশে উঠতি যুবকদের আনাগোনা শুরু হয়! কেউ মনের সুখে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় গান শুরু করে,‚ও গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়া!“ এমন সময়,কেউ একজন বলে ওঠে,ওই খাইনকি মাগি বাইর আয়,দেখ তোর নাগররা চইলা আইছে! জলদি বাইর হ,নয়তো খবর আছে! প্রতিদিন মাঝরাতেই সিগন্যালের বখাটে কয়টা এমন অত্যাচার শুরু করে দেয়! সারারাত ধরে তার শরীর নিয়ে খেলা করে,ভোর হওয়ার আগে আগে নেশার ঘোর কেটেগেলে চলে যায়! মাঝে মাধ্যে তার ইনকামের টাকা হাতিয়ে নিয়ে চলে যায়! এই অত্যাচার দিনকে দিন বেড়েই চলছে আর সহ্য হয়না! এভাবে আর কতদিন,এবার সবকিছুর মায়া ফেলে দূরে কোথাও,চলে যাবে! স্বামীর জন্যে আর কত অপেক্ষা করা যায়! পাশের বাড়ির রহিমা ভাবী ঠিকই বলছে,ব্যাডা মানষের ঠিক ঠিকানা নাই! দেহো দেখি বানিসান্তার কোনো খানকি মাগির লগে না ঘর বানছে! এই কথাটা শামীমার হৃদয়ে এখনো খুব বেশি করে বাজে! যে মানুষকে এতো বেশি ভাল বাসলো সে কীভাবে এতোদিন দূরে থাকতে পারে! সেই যে জব্বারের জালি বোটে করে করমজল মাছ ধরতে গেলো,আর ফিরে আইলোনা! জব্বার মানুষটা বেশি সুবিধার নয়,সে প্রায়ই শামীমার দিকে কুদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো! প্রায়ই যখন শামীমার স্বামী খোকন মিয়া বাড়ি থাকতোনা তখনই জব্বার মিয়া শামীমার কাছে এসে হাজির হতো,আর মুখপুরে পান খেয়ে লাল করে উন্মাদ হাসি দিয়ে বলতো, কি ভাবিসাব,খোকন মিয়া বাড়ি নাই! _ না,হ্যায় তো একটু দ্বিগরাজ বাজারে একটু বাজার-সদাই করতে গেছে! কেন আপনে জানেননা,সব সময় তো একলগে ঘোড়েন! জানি তয়,একটু আপনের চাঁন মুখখান দেইকপার আইলাম! _ দেহা হইছে এইবার যান,হ্যয় চইলা আইবো! আসুক সমস্যা কী,দুজনই একসাথে রাতের খাওয়া খেয়ে দুবলার চরে রাশমেলা দেখতে যাবো! _ নিজে যাবেন যান,হ্যরে নিয়ে যাওনের কী দরকার! আপনে হ্যরে খারাপ খারাপ জায়গায় নিয়া যান,আর কষ্টকরা টাকাগুলা নষ্ট করেন। জানেন ভাবি,দুবলার চরে রাশ মেলায় গেলে সে যে কতো সুখ পায়! _ নিজের বউ থাকতে অন্য সুখের কী দরকার! নিজে যাবেন তো যান,হ্যারে নিয়া যাইতে পারবেন না! কইলেই হইলো,আজ সারারাত ধরে দুজনই মজা করবো! আর ভাবী আপনে যদি সেই সুখ দিতে পারতেন,তাইলে কী আর খোকন মিয়া সেসব জায়গায় যায়? _ সেটা হেই ব্যডায় ভালো জানে,তারে সুখ দিতে পারি কিনা! আমারও মাঝেসাঝে একটু সুযোগ দিতে পারেন,দেখি কেমন সুখ দিতে পারেন? _ কী সব কথা বলেন আপনে,আপনে আমারে যেমন ব্যাডি মনে করছেন আমি কিন্তু তেমন ব্যাডি না! সমস্যা কী,খোকন মিয়া এখানে সেখানে গিয়া খানকির লগে মজা লুটাচ্ছে! তুমিও না হয় একটু আধটু পরপুরুষের মজা নিয়া দেহো কেমন লাগে! _ তওবা তওবা,এমন কথা কানে হোনাও পাপ! আপনে এহনি বাড়ির বাইরে চইলা যান,আপনেরে আমি বড় ভাইয়ের মতোন জানি,আর আপনে এসব কি কন! তুমি যাই কওনা কেন,এক দিনের যন্নি হইলেও তোমারে আমার জালি বোটে নিয়া পশুর নদীর মাঝখানি গভীর রাতে বুকের মাঝে নিয়া রাইত কাটামু! _ আমারে না নিয়া,আপনে নিজের বউ আছে,বউরে নিয়া পশুর নদীতে রাইত কাটাইয়েন! সে সময় হলেই টের পাবানে! এরপর বিভিন্নভাবেই জব্বার মিয়া শামীমারে ফুসলায়ে গেছে,কিন্তু শামীমা কোনোভাবেই রাজি হয়নি! তবে জব্বার মিয়া শামীমার প্রতি যতোই লোলুপদৃষ্টি দিক না কেন,সে খোকন মিয়ারে অনেক ভালোবাসতো,আর যাই হোক জব্বার মিয়া খোকন মিয়ারে ষড়যন্ত্র কইরা করমজল নিয়া মাইরা আইবো এটা শামীমার বিশ্বাস হয়না! এমনও হতে পারে জব্বার মিয়া খোকন মিয়ারে ফুসলাইয়া বানিসান্তার কোন খানকির সাথে বিয়া দিয়া ওখানেই রাইখা দিছে! যাতে সে সহজেই শামীমার দেহটা পায়! কিন্তু শামীমার এককথা এ দেহটা একমাত্র তার স্বামীর সম্পত্তি,এটাতে চাইলেই যেকেউ ভাগ বসাতে পারবেনা! তার বিশ্বাস খোকন মিয়া যে খানকিরে নিয়াই রাত কাটাকনা কেন,একদিন সে ঠিকই শামীমার যোনিসুখ অনুভব করে আবারও ফিরে আইবো! গতবার আইলার সময়ে সাগর বুকে অচেনা এক ঢেউ খেলা শুরু করলো! সে ঢেউ যেনো এসে মিলিত হতে থাকলো পশুর নদীর তীরবর্তী সিগন্যাল চরকানার বস্তিতে! অন্য সকলের মতো শামীমাও শুধু আল্লাহ আল্লাহ করেন,না জানি তার কপালে এবার কোন দুঃখ জুটবে। খোকন মিয়া অনেক দিন হলো নিখোঁজ,সবাই যে যার মতো নিজেদের আসন্ন বিপদের আশংকায় দিশেহারা।চারদিকে ঘোষণা চলছে মোংলা সমুদ্র বন্দরের খুব কাছেই ঘুর্ণিঝর আইলার অবস্থান,সবাই নিরাপদ স্থানে অবস্থান করুন।সবাইকে সাইক্লোন স্যাল্টার এ যাওয়ার জন্য বারবার বলা হচ্ছে! কিন্তু কারোরই যেন কোনো মাথা ব্যথা নেই,কত ঝড়ই তো জীবনে দেখলাম! সকাল থেকে থেকে থেকে বৃষ্টিপাত মাঝেমধ্যে হালকা বাতাস! প্রকৃতি অন্যান্য দিনের মতোই স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল সবার,কিন্তু সময় যতো গড়িয়ে গেলো চারদিক ঘন অন্ধকার,চারদিকে যেন মোচড় দিয়ে দিয়ে আইলা তার তান্ডবলীলা শুরু করলো! সেইসাথে আট থেকে দশ ফুটের জলোচ্ছ্বাস,এ যেনো কেয়ামতের নামান্তর।সবার ঘরের চাল হাওড়ার সাথে উড়ে উড়ে হারিয়ে যাচ্ছে নিমিশেই।হঠাৎই শামীমার ঘরে চাল উড়ে চলেগেলো পশুর নদীর মাঝখানটাতে,যেখানে গিয়ে মাঝেমধ্যে শামীমা আত্মাহুতি দিতে চায় ঠিক সেখানেই।বৃষ্টিতে তার শরীর ভিজে একাকার,একটা পলিথিনের ভিতরে নিজেকে আর বাচ্চাটারে মোড়ায়ে নিয়ে কোনরকম চালনা বন্দর হাইস্কুলের বারান্দায় এসে আশ্রয় নিলো! ততক্ষণে সেখানে তারমতো শপাঁচেক লোক এসে জড়ো হয়েছে,আর আল্লাহর নাম জপ করতেছে! একসময় ঝড় থেমে গেলো যে যার মতো নিজ নিজ বাড়িতে ফিরেগেলো,কিন্তু ফিরে পেলনা থাকার মতো নিরাপদ একটু আশ্রয়! কেননা কমবেশি সবারই বাড়ি ঘর ঝড়ের প্রকোপে কোথায় গেছে ঠিক নেই! গোটা এলাকা যেন একটা মৃত্যু পুরী। এখানে সেখানে মানুষ,পশু পাখির লাশ আর লাশ! এরপরেই সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এনজিও বিভিন্ন সাহায্যও সহযোগিতা নিয়ে চরাঞ্চলের মানুষের সামনে হাজির।কিন্তু এখানেও একশ্রেণির দালাল তাদের দৌরাত্ম্য শুরু করে দিলো! তাদের সুপারিশ ছাড়া কোনো সাহায্য-সহযোগিতই আর মেলেনা! কিন্তু শামীমা কী করবে,তারঘর নেই,স্বামী নেই হাতে টাকাপয়সা নেই,খোলা আকাশের নিচেই বাচ্চাসহ তার স্থান! যার কাছেই সে যায় নাম ঠিকানা নেয়,কিন্তু সাহায্য আর পায়না! শামীমা আর থাকতে না পেরে অবশেষে জব্বার মিয়ার বাড়িতে হাজির! কেননা জব্বার মিয়ার সাথে প্রশাসন ও বিভিন্ন এনজিওর লোকজনের সাথে ভালো জানাশোনা! সে অনেকের জন্যই ত্রাণের ব্যবস্থা করে দিয়েছে,শামীমাও নিশ্চিত খালি হাতে ফিরবেনা! গত তিনদিন তার শরীরে একটুও দানা পানি পরেনি! শরীরটা যেনো পাইস্স্যা মাছের শুটকির মতো হয়ে পরেছে! চলার মতোনও শক্তি নাই শরীরে,মনে হয় এখনই পরে যাবে মাটিতে! কোন রকমে কোলের বাচ্চাটারে নিয়া জব্বার মিয়ার বাড়িতে হাজির হলেও লজ্জায় মুখ ফুটে বলতেও পারছেনা,আমার একটু সাহায্যের ব্যবস্থা করে দেন! জব্বার মিয়াই শামীরারে দেখতে পেয়ে একগাল হাসি দিয়ে বলতে লাগলো কী খোকনের বউ,এই ভরদুপুরে কি মনে কইরা আমাগো বাড়ীত? – আপনে তো জানেন,হ্যায় কতদিন বাড়িত নাই,আমার বাড়িঘর সবই পশুর নদী গিলা খাইলো ঘরে একটুও দানা-পানি নাই,একটু চাল,নুন ছিলো সেটাও বানের জলে ভাইসা গেছে! এখন মুই কই যামু,বাচ্চাডারে কী খাওয়ামু? তো মুই কি করতে পারি তোমার জন্য! যাও এনজিও আর প্রশাসনের লোকজনের কাছে হ্যারাই সাহায্য দিবো! – মুই অনেক জায়গায় গেছি,হ্যই ব্যাডারা নাম লয় কিছু দেয়না! আপনে একটু সুপারিশ করি দেন মোরে! নইলে বাচ্চাডা নিয়া না খাই মরুম! সেটা নাই করলাম,ওই ব্যাডারা টাহা ছাড়া কোনো কাজ করতে চায়না! চার পাঁচ হাজার টাহা লই আও,বাকিটা মুই দেখছি! – কি কন মিয়াসাব আপনে,ঘরে টাহা থাকলে মুই তোমার লগে আইতাম! তাহলে মুই কি করতে পারি? আপনি যেকরি হউক মোরে একটা ঘর আর খাওয়ার ব্যবস্থা করি দেন! মোর আপনে ছাড়া এই এল্যাকায় ক্যডায় পরিচিত আছে! আচ্ছা তা দেখবানে,মুই তোমারে যে কথাডা কইছিলাম! তুমি যদি রাজি থাকো আইজকা রাইতটা থাইকা যাইতে পারো! গতকাইল তোমার ভাবী আর বাচ্চা গো ওদের নানা বাড়ি পাঠ্যায় দিছি! কী করবে শামীমা,নিজের সতীত্ব বিক্রি করবে এই জানোয়ারটার কাছে,নাকি ভরা পশুর নদীতে ঝাপিয়ে পরবে! কিন্তু বাচ্চাটার মায়া তাকে বারবার না করছে! সে পেটের ক্ষুধার কাছে নতি স্বীকার করে মাথা নিচু করে আছে দেখে জব্বার মিয়া খুশিতে পুরা বত্রিশটা দাত বের করে একগাল হাসি দিলো! বললো যাও রান্নাঘরে খাবার আছে যা খুশী খাও গে! খাইয়া পইরা আমার জন্যি হাকিমপুরী জর্দা দিয়া এক ছিলি পান বানায় রই আও! তুমি যতদিন আমারে খুশি করবা,আমি তোমারেও খুশী করুম! সারারাতের অনবরত স্টিমরোলারের আঘাতে যেন শামীমার শরীরটা ব্যথায় কাতর হয়ে পরেছে! জব্বার মিয়া লোকটা পুরাই একটা জানোয়ার,নয়তো কেউ কাউরে এভাবে ফাঁদে ফেলে এতো বেশি জ্বালা দেয়! মনে হয় কোনো ওষুধ খেয়ে বিছানায় গিয়ে শামীমার ওপর স্টিম রোলার চালিয়ে দিয়েছে! তবে শতকষ্ট হলেও শামীমার শরীরটা যেনো অনেক দিনের পরে জীবনের স্পন্দন ফিরে পেয়েছে! অনেক বছর পর কোনো মাঠে যখন বৃষ্টির ধারা এসে বন্যার সৃষ্টি হয়,সে সময় যেমন সেখানকার গাছপালায় প্রান ফিরে আসে ঠিক তেমনি করে আজ শামীমার ভগ্ন শরীরেও যেনো প্রান ফিরে আসলো! একটু না হয় কষ্ট হলো,তাতে কী!শরীরটা তো কিছুটা সুখ পেল! এখন শামীমার নতুন ঘর হইছে,ঘরে খাওয়ার অভাব নাই! এলাকার উঠতি যুবক হইতে পাড়ার বৃদ্ধ পযন্ত সবাই শামীমার পানের খিলি খাওয়ার লোভে আশপাশ ঘুরপাক খায়! মাঝরাতে নেশাগ্রস্ত যুবক ভাঙা গলায় গানের সুরে শামীমাকে দূর হতে ইঙ্গিতে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে! এখনো মাঝেসাজে তার ওপরে পাশবিক ঝর বহে যায়। একজনের কথা বলে ভারা করে দূরে নিয়ে যেয়ে দশ-বারোজন হামলে পরে,তার ভগ্ন শরীর নিয়ে খেলা করে।মাঝেমধ্যে আবারও মনে হয় ভরা পশুর নদীর বুকে ডুব দিবে,তবে পারেনা! আত্মহত্যা যে এ নারকীয় জীবনের চেয়েও আরও যন্ত্রণার! তবুও সে এ নরক যন্ত্রণা হতে মুক্ত হওয়ার স্বপ্ন বুনে! একদিন দূরে বহুদুরে চলে যাবে! হয়তো সেখানে কেউ তারে ব্যইশ্যা বলবেনা,খানকি বলবেনা! কিন্তু কিসের এক মায়াজাল তাকে চরকানার এই বস্তি ছাড়তে দেয়না! এটা পশুর নদীটার মায়া নাকি খোকন মিয়ার ফিরে আসার মিথ্যে স্বপ্নের মায়াজাল! তবে সে ঠিকই একদিন সব মায়া ভুলে নিশ্চিত কোনো অজানায় খুজেঁ নিবে জীবনের নতুন পথচলা!